নরকলিকাতার গর্ব
জনাব এ কে এম শহীদুল হক বিপিএম, পিপিএম
একটি জনপদের গৌরব শুধু তার মাটি, নদী কিংবা ঐতিহ্যে নয়; সেই জনপদকে আলোকিত করে তার কৃতী সন্তানরা। তাঁদের কর্ম, মেধা, সততা ও দেশসেবার ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার নরকলিকাতা গ্রামের কৃতী সন্তান জনাব এ কে এম শহীদুল হক বিপিএম, পিপিএম তেমনই একজন গর্বিত ব্যক্তিত্ব, যাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও দেশসেবার অধ্যায় আমাদের এলাকার মানুষের জন্য গর্ব ও অনুপ্রেরণার।
জনাব এ কে এম শহীদুল হক এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবের মাটির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এই মানুষটি কঠোর অধ্যবসায়, মেধা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে জীবনের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজকল্যাণ বিষয়ে এমএসএস ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি এবং পরবর্তীতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ ডিগ্রি লাভ করেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৬ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি চাঁদপুর, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম ও সিরাজগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ডিআইজি হিসেবে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, রাজশাহী রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনারসহ পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান হলো কমিউনিটি পুলিশিংয়ের প্রসার ও জনপ্রিয়করণ। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে অপরাধ দমন এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানের যে দর্শন—তিনি তা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মানুষের নিরাপত্তাকে শুধু পুলিশের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে জনগণকে সম্পৃক্ত করে একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার ভাবনাকে তিনি কার্যকর রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এই দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) এবং রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম)-এ ভূষিত হন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কম্বোডিয়া, অ্যাঙ্গোলা ও সুদানে দায়িত্ব পালন করে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং জাতিসংঘ শান্তি পদকে ভূষিত হন। কমিউনিটি পুলিশিংয়ে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যেও তিনি সম্মানিত হন।
অবশেষে তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়—৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ। ৩১ জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব পালন করেন। আইজিপি হওয়ার পূর্বে তিনি সচিব পদমর্যাদায় বাংলাদেশ পুলিশের অ্যাডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল (প্রশাসন ও অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি শুধু একজন সফল পুলিশ কর্মকর্তা নন; একজন লেখক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং বিষয়ে তাঁর রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ জ্ঞানচর্চা ও পেশাগত শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Police and Community with Concept of Community Policing, কমিউনিটি পুলিশিং কী এবং কেন, বাংলাদেশ পুলিশ সারগ্রন্থ, Community Policing Concept, Aims and Objectives এবং Bangladesh Police Hand Book।
একজন মানুষের সাফল্য তখনই সত্যিকার অর্থে মহিমান্বিত হয়ে ওঠে, যখন তাঁর অর্জন ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ ও দেশের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। জনাব এ কে এম শহীদুল হকের জীবন আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—সাফল্যের জন্য প্রয়োজন স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন শিক্ষা, সততা, অধ্যবসায় ও দেশপ্রেম।
নরকলিকাতার মাটি থেকে উঠে এসে বাংলাদেশ পুলিশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়া নিঃসন্দেহে এ জনপদের জন্য এক গৌরবের বিষয়। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জীবন্ত প্রেরণার গল্প—যে গল্প বলে, প্রত্যন্ত জনপদ থেকেও একজন মানুষ তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে জাতীয় জীবনে অসামান্য অবদান রাখতে পারেন।
নরকলিকাতার এই কৃতী সন্তান আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেরণা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।